বসন্তে বাংলাদেশ
বসন্ত ষড়ঋতুর শেষ ঋতু।ফাল্গুন এবং চৈত্র মাস মিলে হয় বসন্ত ঋতু । আমাদের সত্যিকারের বসন্তকে আমরা পাই ফালগুনে--যখন শীতের আমেজ প্রকৃতি থেকে বিদায় নেয়নি , কিন্তু গ্রীষ্ম অগোচরে তার রক্তাক্ত বল্লম নিয়ে প্রকৃতির অঙ্গনে এসে দাড়িয়েছে । যাদের অনুভুতি তীক্ষ্ণ , তারা কেবল বসন্তের নয় সব ঋতুর আগমনেই কম বেশি সাড়া দিতে পারে ।
প্রায় জোয়ার ভাটার মতো আমাদের দেশের ঋতুগুলো কেবলই পাল্টে যাচ্ছে ।একটা ঢেউ উঠতে না উঠতে মিলিয়ে যাচ্ছে পরের ঢেউয়ের সাথে ।ফালগুনে বিশুদ্ধ বসন্তের আমেজ থাকলেও চৈত্রে বসন্তের পরিপূর্ন স্বাদ নেই ।
বসন্ত যৌবনের দূত , নবজীবনের প্রতীক ।ঋতুরাজ বলে তার খ্যাতি আবহমানকাল থেকে। মীতের ঘনগোর কুয়াশায় আবছা হয়ে আসা দিগন্তরেখা , কনকনে হাওয়ায় রুক্ষ হয়ে ওঠা মৃতপ্রায় প্রকৃতিতে বসন্ত ফিরিয়ে আনে নতুন কুড়ির উদ্গম। ফুল--পাতায় সন্জীবিত হয়ে ওঠে নিসর্গ।চলুন দেখে আসি কবিদের কবিতায় বসন্তের সুন্দার প্রকৃতি । আমার আজকের আর্টিকেল বিখ্যাত কবিদের কিছু জনপ্রিয় বসন্তের কবিতা নিয়ে।
বসন্তের কবিতা
কালো কোকিলের গল্প (নির্মলেন্দু গুন)
কালো বোরকা পরা মেয়েদের কালো চোখ
তবু আমাদের চোখে পরে
আবুধাবির মপিং মলে আমি চোখের পাশাপাশি
তাদের সুন্দর নাসিকিাও দেখেছি ।
অথচ এই বৃক্ষমাতৃক বঙ্গদেশে
হে আমার সুরেলা সুকন্ঠী কোকিল ,
আমি কখনো দেখতে পাইনি তোমাকে ।
কী করেই বা তোমাকে দেখব বলো ,
তুমি তো জন্মই নিয়েছ
কালো বোরকার চেয়ে কালো পালকে
তোমার ছোট্ট দেহটিকে আবৃত করে ।
তোমার চোখ আমাদের চোখেই পড়ে না ।
তদুপরি পাতার আড়ালে থাকতে ভালোবাসো তুমি।
বলো তো তুমি নিজেকে লুকিয়ে রাখো কেন?
কালো বলে ?
এটা কোন কথা হলো ?
কালো বলে আফ্রিকার মেয়েরা লুকিয়ে থাকে নাকি?
প্যারিস ও নিউইয়র্কের পথে পথে আমি তো দেখেছি
কালো মেয়েরা বুক ফুলিয়ে , কোমর দুলিয়ে হাঁটছে ।
গর্বে তাদের পা পড়ে না মাটিতে ।
বসন্তের সাথে তোমার গোপন সম্পর্কের বিষয়টা
আমাকে বলবে ?আমি কাউকে বলব না।
জানি , সব মানুষের েএকটা গোপন গল্প থাকে ।
তোমারও একটা আছে নিশ্চয়।
তুমিও কি আমার মতো ব্যর্থ হয়েছ কারও প্রেমে?
আমি আমার বুকে হাত রেখে বলছি----
প্রতিটি বসন্ত সমাগমে তোমার কুহুধ্বনি শুনে
আমি তোমার প্রেমে পড়েছি বারবার ।
তা তুমি যতই কালো হও প্রিয় তমা আমার ,
যতই তুমি কালো পালকের বোরকা পরে রও --
একদিন নিশ্চয়ই আমি তোমার দেখা পাবো ।
বসন্তের দুপুরে (আরিফ সর্দার )
তুমি অজান্তে বসন্তে এসে
মনটা নিলে কেড়ে ,
হারিয়ে গেলাম আমি সেই
এক বসন্তের দুপুরে ।
কোকিল হয়ে তুমি সেদিন
করেছিলে আগমন ,
কুহু কুহু সুরে বরে দিলে
তুমি হৃদয়ের কানন ।
হৃদয় বাগান মুখরিত হলো
তোমার সুরের ভীড়ে ,
হারিয়ে গেলাম আমি সেই
এক বসন্তের দুপুরে ।
আবার কেকনো এলে তুমি
প্রজাপতির রুপে ,
হারকা হালকা ছুয়ে গেলে
গোপনে চুপচুপে ।
তোমার ডানার রং মাখিয়ে
গেলে আমার গায় ,
শিহরিত হয় হৃদয় মন আমার
শীতল স্নিগ্ধতায় ।
কতবার ঘুরে ফিরে গেলে
আমার জীর্ণ নীড়ে ,
হারিয়ে গেলাম আমি সেই
এক বসন্তের দুপুরে ।
প্রজাপতি কোকিল না হলে
তুমি কে ছিলে জানি ,
হাজারো রুপের আড়ালে থেকে
শুধুই টানাটানি !
হৃদয় ব্যাকুল করে ওগো
দেখাও আশার আলো ,
বাজলে ওই সুর প্রানে তবে
ঘুচবে আধার কালো ।
সেই রকম সব বসন্তকাল
আসুক জীবন জুড়ে ,
হারিয়ে গেলাম আমি সেই
এক বসন্তের দুপুরে।
বসন্তের আসরে ঝড় (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর )
বসন্তের আসরে ঝড়
যখন ছুটে আসে
মুকুলগুলি না পায় ডর ,
কচি পাতারা হাসে ।
কেবল জানে জীর্ণ পাতা
ঝড়ের পরিচয় --
ঝড় তো তারি মুক্তিদাতা,
তারি বা কিসে ভয়।
কোথাও বসন্ত আসবে (মহীবুল আজিজ)
কোথাও বসন্ত আসবে বুঝি তাই কাঁপছে চতুর্দিক ,
বাগানে নেই তো কী হয়েছে বলো ক্যালেন্ডারে ফোটা
ফুলের গন্ধেই মাতোয়ারা সব হাসছে দিগবিদিক----
চেয়ে দেখো ওই রাখা আছে পাশে ঘোষনা যন্ত্রটা ।
কোকিল আসেনি বলে কি বসন্ত এখানে নামবে না !
ধূম্র নগরীর বাসিন্দা আমরা নিজেরাই বানাই
নিজেদের রীতি সকলের সাথে কখনো মিলবে না ,
এক বিসমিল্লায় কি বাজায় বিশ্বের সমস্ত সানাই !
আসুক কোকিল ধোয়াধূরি ঠেলে দিন কয়েক পরে,
হেভিডেসিবেল যন্ত্র আছে তৈরি অতন্দ্র দিনমান ।
সুমশ্রিন গলা না হয় শোনাবে খানিকটা ঘর্ঘরে ,
এসেছে বসন্ত ঊর্ধ্বে--অধে দেখো জেগেছে উত্থান।
তোমার তরঙ্গে উড়ে ( মুহম্মদ নুরুল হুদা)
খুব ভোরে উড়ে গেছি ভেষজশালায় ,
বাতাসের বুক থেকে কুড়িয়েছি আরোগ্য নিদান ।
তুমিও এসেছ উড়ে প্রজাপতি রঙিন ডানায় ,
মাটিতে ছড়িয়ে দিয়ে অপরুপ অমরার ঘ্রান ।
গিলগামেশের দেহ নেই কারো আমাদের ,
মৃত্যুপুরী পার হয়ে অমরায় আমরা আসিনি ।
তোমার তরঙ্গে উড়ে তবু আমি পেয়ে যাই টের ,
অনিদ্রানাশক আমি , তুমিও তো অনিদ্রানাশিনী ।
এভাবেই সত্যাগ্রহ পরস্পর মিলন বিরহ ,
আমরা রচনা করি আমাদের আরোগ্য কাহিনি ।
বসন্ত আওল রে (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর )
বসন্ত আওল রে!
মধুকর গুন গুন , অমুয়া মন্জরী
কানন ছাওল রে ।
শোন শোন সজনী হৃদয় প্রান মম
হরখে আকুল ভেল ,
জর জর রিঝসে দুখ জ্বালা সব
দুর দুর চলি গেল ।
মরমে বহই বসন্ত সমীরন,
মরমে ফুটাই ফুল ,
মরমকুন্জ‘পর বোলই কুহু কুহু
অহরহ কোকিলকুল ।
সখি রে উছসত প্রেমভরে অব
ঢলঢল বিহ্বল প্রান ,
নিখিল জগত জনু হরখ - ভোর ভই
গায় রভসরসগান ।
বসন্তভূষণভূসিত ত্রিভুবন
কহিছে দুখিনী রাধা ,
কহি রে সো প্রিয় ,কহি সো প্রিয় তম ,
হৃদিবসন্ত সো মাধা ?
ভানু কহত অতি গহন রয়ন অব ,
বসন্তসমর শ্বাসে
মোদিত বিহ্বল চিত্তকুন্জতলে
ফুল্ল বাসনা --বাসে।
লুন্ঠিত বসন্তে (ওমর কায়সার )
ফুরিয়ে যাওয়ার আগে প্রকৃতির কাছ থেকে
এক টুকরো বসনন্ত লুটে নেব ।
একদিন হিমালয় থেকে নেমে
বরফের দেবী মিনতি জানাবে ।
হিরামন পাখির পালক দেবীর মুকুটে
শিমুরের পাপড়িরা কন্ঠহারে দ্যুতি দেবে
মৃত সব সুরমূর্ছনায় ।
দেবী মধুকরী প্রার্থনায় নত
ভিক্ষা নেবে চৈত্রের কিছুটা সুবাস অ
লুন্ঠিত বসন্তে আমি পার করে দেব
শতাব্দীকালের চেয়ে দীর্ঘ বিবর্ন হিমযুগ।
বসন্ত অবসান( রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
কখন বসন্ত গেল, এবার হল না গান !
কখন বকুল-মূল ছেয়েছিল ঝরা ফুল ,
ককন যে ফুল ফোটা হয়ে গেল অবসান !
কখন বসন্ত গেল , এবার হল না গান !
এবার বসন্তে কি রে যুথীগুলি জাগে নি রে !
অলিকুল গুন্জরিয়া করে নি কি মধুপান !
এবার কি সমীরন জাগায়নি ফুলবন ,
সাড়া দিয়ে গেল না তো , চলে গেল ম্রিয়মাণ !
ককন বসন্ত গেল এবার হর না গান !
যতগুলি পাখি ছিল গেয়ে বুঝি চলে গেল ,
সমীরনে মিলে গেল বনের বিলাপতান ।
ভেঙেছে ফুলের মেলা , চলে গেচে হাসি খেলা ,
এতক্ষনে সন্ধাবেলা জাগিয়া চাহিল প্রান ।
কখন বসন্ত গেল , এবার হল না গান !
বসন্তের মেষ রাতে এসেছি রে শূন্য হাতে ,
এবার গাঁথি নি মালা , কী তোমারে করি দান !
কাঁদিছে নীরব বাঁশি , অধরে মিলায় হাসি,
তোমার নয়নে ভাসে ছলছল অভিমান ।
এবার বসন্ত গের ,হল না হল না গান !
বসন্তের আগমন ( মামুন আকাশ )
শীত ঋতুর নির্গমনে
ঋতুরাজ বসন্তের আগমন ।
ঘুমন্ত প্রকৃতির চোখ হলো উম্মচন ।
পৃথিবী সাজলো স্বর্গীয় রুপে ।
কৃষ্ণচূড়া , পলাশ শিমুল ফুলের লাল রঙে রন্জিত হলো।
কোকিলের কুহু কুহু গান ,চারদিক সাজে সবুজের সবুজে ।
ধরনি সাজে নতুন রুপে ….
বসন্তের রঙ বিলীন হয়ে যায় প্রিয় জনের বিবাদের বিভিন্ন রঙে ।
শুনিনা আজি কোকিরের ঐ মধুর ডাক
সর্বত্র শুধু দেখি বিষাক্ত ধোয়া ।
আগের মত নেই সুগন্ধী পুস্প ঝাঁক
নেই কোথাও সে সবুজের ছোয়া ।
তবুও বসন্ত আসুক এ ধারায় বার বার …..।
প্রিয় পাঠক আর্টিকেলটি পড়ার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। বসন্তের কবিতা , বসন্ত নিয়ে প্রেমের কবিতা পড়তে আমাদের সাথেই থাকুন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন