শনিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২২

অধিক ফলন পেতে সঠিক করলা চাষ পদ্ধতি.. কৃষি তথ্য ।

করলা বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় সবজি । করলা  একটি পুষ্টিকর খাদ্য । অনেকে তেতো স্বাদের  জন্য  করলা থেকে দূরে থাকে । করলার অনেক ঔষধি গুন রয়েছে। করলা একটি সম্ভাবনাময় ফসল ।

করলা চাষ করে অধিক ফলন পেতে হলে সঠিক করলা চাষ পদ্ধতি জানতে হবে ।আজকে আমরা জানবো করলা চাষের সঠিক পদ্ধতি । 

আরও পড়ুন:  করলার ঔষাধি গুনাগুন সম্পর্কে  জানুন ?




    সঠিক করলা চাষ পদ্ধতি
    সঠিক করলা চাষ পদ্ধতি


    করলার জাত 

    ক্রমিক নং

     জাতের নাম

    ফলন (টন/ হেক্টর)  

    প্রধান বৈশিষ্ট্য 

    ০১

    বারি হাইব্রিড করলা -২

    ৩৫-৩৮

    • প্রতি  গাছে গড়ে ৪৫ টি করলা ধরে ।
    • ফলের গড় ওজন ১৪১.৩ গ্রাম।
    • ফল ধরার পর ৯৬ দিন পর্যন্ত  সংগ্রহ করা যায়।
    • খেতে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ।

    ০২

    বারি হাইব্রিড করলা -৩

    ২৫-২৮

    • জাতটি খরপি মৌসুমে  আবাদ করা য়ায় ।
    • বীজ বপনের (১০০-১২০) দিনের মধ্যে ফল ধরে ।
    • গাছ প্রতি  গড়ে ৩৭ টি ফল ধরে ।
    • ফলের গড় ওজন ১১২.৭ গ্রাম।
    • গড়ে গাছ প্রতি ফলন ৪.১৭ কেজি।

    ০৩

    বারি করলা -৪

    ২২-২৫

    • উচ্চ ফলনশীল , গাছ প্রতি ফলের সংখ্যা গড়ে ৪০ টি ।
    • ফলের গড় ওজন ১০৭ গ্রাম ,গাছ প্রতি ফলন ৪ কেজি ।
    • ফল মাঝারি সবুজ , লম্বা চোঙাকৃতির এবং আচিলযুক্ত।
    • জাতটি ভাইরাস রোগ সহনশীল ।

    ০২

    বারি  করলা -১

    ২৫-৩০

    • বীজ বপনের (৫৫-৬০) দিনের মধ্যে ফল ধরে ।
    • গাছ প্রতি  গড়ে ২৫-৩০ টি ফল ধরে ।
    • ফলের গড় ওজন ১০০ গ্রাম।
    • গড়ে গাছ প্রতি ফলন ৩.৩৬ কেজি।

    ০২

    গজ করলা 

    ২০-২৫

    • বীজ বপনের (৫৫-৬০) দিনের মধ্যে ফল ধরে ।
    • গাছ প্রতি  গড়ে ১৫-২০ টি ফল ধরে ।
    • ফলের গড় ওজন ১৫০-২০০ গ্রাম।
    • গড়ে গাছ প্রতি ফলন ৪ কেজি।


    বিষয়বস্তু

    জীবনকাল 

    জাত ও আবহাওয়াভেদে  কম বেশি হতে পারে । তবে এদের মোট জীবন কাল  ১২০ -১৩৫ দিন । 

    জমি নির্বাচন 

    সব রকম জমিতেই   করলার চাষ করা যেতে পারে । তবে জৈব সার সমৃদ্ধ , পানি জমে না এমন  দো-আঁশ  ও বেলে দো-আঁশ  মাটিতে ভালো জন্মে । লবণাক্ত এলাকায়  উচুঁ বেড তৈরি করে চাষ করা যায় ।

    জমি তৈরি 

    মাদায় চাষের ক্ষেত্রে :

    বসতবাড়িতে  করলা চাষের ক্ষেত্রে  মাদায় বীজ বুনতে হয় ।  তাই ১.৫ -২ মিটার দুরত্বে ৫০-৫৫ ঘন সেমি  আকারের  গর্ত তৈরি করতে  হবে  । গোবর এবং সার গর্তের মাটির সাথে মিশিয়ে  দিতে হবে ।

    বাণিজ্যিক  চাষের ক্ষেত্রে :

    প্রথমে সম্পূর্ন জমি ৪-৫ বার চাষ  ও মই দিয়ে প্রস্তুত করে  নিতে হবে । জমি বড় হলে নির্দিষ্ট দুরত্বে নালা কেটে রম্বায় কয়েক ভাগে ভাগ করে নিতে হয় । বেডের প্রশ্বস্ততা হবে ১.০ মিটার এবং দুবেডের মাঝে ৩০ সেমি নালা থাকবে । 


    সারের  পরিমান ও প্রয়োগ 

    সারের নাম 

    মোট পরিমান (হেক্টর )

    মোট পরিমান (শতক)

    জমি তৈরির সময়  (শতক)

    রোপনের ৭-১০ দিন পূর্বে

    পচা গোবর 

    ২০ টন

    ৮০ কেজি 

    ২০ কেজি 

    ৫ কেজি 

    টিএসপি 

    ১৭৫ কেজি 

    ৭০০ গ্রাম 

    ৩৫০ গ্রাম 

    ৩০ গ্রাম 

    ইউরিয়া 

    ১৭৫ কেজি

    ৭০০ গ্রাম

    -

    -

    এমপি 

    ১৫০ কেজি 

    ৬০০ গ্রাম

    ২০০ গ্রাম 

    ২০ গ্রাম 

    জিপসাম 

    ১০০ কেজি 

    ৪০০ গ্রাম

    ৪০০ গ্রাম 

    -

    দস্তা সার 

    ১২.৫ কেজি 

    ৫০ গ্রাম 

    ৫০ গ্রাম 

    -

    বোরাক্স

    ১০ কেজি 

    ৪০ গ্রাম 

    ৪০ গ্রাম 

    -

    ম্যাগনেসিয়াম

    ১২.৫ কেজি 

    ৫০ গ্রাম 

    -

    ৫ গ্রাম 

    সারের নাম 

    রোপনের ১০-১৫ দিন পর 

    রোপনের ৩০-৩৫ দিন পর 

    রোপনের ৫০-৫৫ দিন পর 

    মোট পরিমান (মাদা প্রতি)

    পচা গোবর 

    -

    -

    -

    ৫ কেজি 

    টিএসপি 

    -

    -

    -

    ২০০ গ্রাম

    ইউরিয়া 

    ১৫ গ্রাম

    ১৫ গ্রাম

    ১৫ গ্রাম 

    ১৩০ গ্রাম 

    এমপি 

    ১৫ গ্রাম 

    -

    -

    ১৫০ গ্রাম 

    জিপসাম 

     

    -

    -

    ৯০ গ্রাম 

    দস্তা সার 

    -

    -

    -

    ৫ গ্রাম 

    বোরাক্স

    -

    -

    ৪ গ্রাম

    ম্যাগনেসিয়াম

    -

    -

    -

    ৫ গ্রাম 



    বীজ বপনের সময় 

    জাতভেদে সারা বছর করলার বীজ বপন করা যায় । তবে ফেব্রয়ারি  থেকে মে  মাসের মধ্যে বীজ বপন করা উত্তম । কেউ আবার জানুয়ারি মাসে বীজ বুনে থাকেন , কিন্তু এ সময় তাপমাত্রা  কম থাকায়  গাছ দ্রুত বাড়তে পারে না । 

    বীজের পরিমান :

     করলা ও উচ্ছের জন্য হেক্টর প্রতি যথাক্রমে  ৬-৭.৫ ও ৩-৩.৫ কেজি বীজের প্রয়োজন হয় । 

    বীজ বপন পদ্ধতি 

    মাদায় বীজ বপন:

    বীজ বপনের পূর্বে  ১৫-২০ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে নিলে অঙ্কূরোদগম  ভালো হয় ।বীজ  সরাসরি মাদায় বপন করা যেতে পারে ।এক্ষেত্রে  প্রতি মাদায়  ২ টি বীজ বপন করতে হবে ।

    পলিব্যাগে চারা তৈরি :

    নার্সারিতে পলিব্যাগে চারা উৎপাদন করে নেয়া ভালো । সেক্ষেত্রে ৮-১০ সেমি আকারের পলিব্যাগ  ব্যবহার করা যেতে পারে ।প্রথমে অর্ধেক মাটি অর্ধেক গোবর দিয়ে  পলিব্যাগ  ভরে নিতে হবে ।প্রতি ব্যাগে একটি করে বীজ বুনতে হবে ।বীজ  ১-১.৫ সেমি মাটির নিচে পুতে দিতে হবে । পলিব্যাগে চারার বয়স ১৫-২০ দিন হলে  সেই চারা  মুল জমিতে রোপন করতে হবে। 

    পরিচর্যা

    ১. সেচ দেয়া ও নিষ্কাশন :

    • প্রয়োজন  অনুযায়ী  সেচ দিতে হবে । পানির অভাবে গাছের  বিভিন্ন  লক্ষন প্রকাশ পায় । যেমন:-
      1. চারার বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায় ।
      2. পরবর্তিতে ফল ঝরে যায় ।
      3. ফলের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায় ।
    • জুন জুলাই থেকে বৃষ্টি শুরু হলে  আর সেচের প্রয়োজন হয় না । জমির পানি নিষ্কাশনের জন্য নিকাশ নালা সবসময় পরিষ্কার রাখতে হবে ।

    ২. আগাছা  ব্যবস্থাপনা :

    • শুরু থেকে ফল সংগ্রহ পর্যন্ত জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে ।গাছের গোড়ায় আগাছা থাকলে  আশানুরুপ  ফলন পাওয়া যায় না। 
    • সেচের  পর জমিতে চটা বাঁধলে গাছের শিকাড়াঞ্চলে  বাতাস চলাচল করতে পারে না ।কাজেই সেচের পর গাছের গোড়া আলগা করে দিতে হবে। 

    ৩. বাউনি দেওয়া :

    করলার প্রধান পরিচর্যা বাউনির ব্যবস্থা করা । চারা ২০ -২৫ সেমি  উঁচু হতেই ১-২ মিটার উঁচুতে মাচা  তৈরি করে দিতে হবে । সাধারনত উচ্ছে চাষে বাউনি ব্যবহার করা হয় না । জমিতে খর বিছিয়ে দেওয়া হয় । উচ্ছে গাছ খাটো হওয়ায়  এ পদ্ধতিতে ভালো ফলন পাওয়া যায় । তবে এভাবে  বর্ষাকালে করলা চাষ করলে   ফল পঁচে যায় এবং ফলন কম হয় । আর বাউনি বা মাচা ব্যবহার করলে ফলন ২৫-৩০ % বৃদ্ধি পায় । ফলের গুনগত মানও ভালো হয় । 

    বালাই ব্যবস্থাপনা 

     ১. করলার মাছি পোকা 
                                 

    লক্ষন:

    • স্ত্রী মাছি কচি ফলের নিচের দিকে ওভিপজিটর  ঢুকিয়ে  ডিম পারে ।
    • ডিম পাড়ার স্থান থেকে পানির মত তরল পদার্থ বেড়িয়ে আসে  যা শুকিয়ে  বাদামী রং ধারন করে।
    • ডিম থেকে কীড়া  বের হয়ে ফলের শাস খেতে শুরু করে এবং ফল হলুদ হয়ে  পচে ঝরে যায় ।

    দমন :

    • আক্রান্ত ফল বা ফুল সংগ্রহ করে ধ্বংস করা বা পুরে ফেলা ।
    • প্রথম ফুল আসা মাত্র ফোরোমন ফাদ স্থাপন করা ।প্রতি ১০ শতকে ৩ টি করে ।
    • আম বা খেজুরের রসে সামান্য বিষ মিশিয়ে তা বোতলে রেখে জানালা কেটে দিয়ে ক্ষেতে স্থাপন করা ।
    • ১০০ গ্রাম পাকা মিষ্টি কুমড়া  কুচি কুচি করে কেটে তাতে সামান্য বিষ ( যেমন -সপসিন ০.২৫ গ্রাম ) মিশিয়ে বিষ টোপ তৈরি করে মাটির পাত্রে ক্ষেতে স্থাপন করা ।
    • সাইপারমেথ্রিন গ্রূপের  কীটনাশক  ১ মিলি / লিটার হারে  পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা ।(১৫ দিন সবজি খাওয়া বা বিক্রি করা যাবে না )

    ২ .পামনিক বিটল 

    লক্ষন :

    • পূর্ণাঙ্গ পোকা চারা গাছের পাতা ফুটো করে খায় ।
    • কীড়া গাছের গোড়ায়  মাটিতে বাস করে  ।
    • গাছের শিকড়ের ক্ষতি করে এবং বড় গাছ মেরে ফেলতে পারে ।

    দমন :

    • আক্রান্ত গাছ থেকে পোকা হাতে ধরে মেরে ফেলা ।
    • চারা অবস্থায় ২০-২৫ দিন চারা মশারির জাল দিয়ে ঢেকে রাখা ।
    • প্রতি লিটার পানিতে  ২   গ্রাম সেভিন /কার্বারিন -৮৫ মিশিয়ে স্প্রে করা(১৫ দিন সবজি খাওয়া বা বিক্রি করা যাবে না )।
    • গাছের গোড়ায়  ২-৫ গ্রাম  বাসুডিন/ ডায়াজিনন ১০ জি মিশিয়ে  সেচ দেয়া।

    ৩. ভাইরাসজনিত মোজাইক রোগ 

    লক্ষন:

    •  গাছে  হলুদ ও গাঢ় সবুজ ছোপ ছোপ মোজাইক করা পাতা দেখা যায় । 

    দমন :

    • রোগ মুক্ত বীজ বপন করা ।
    • সুষম সার ব্যবহার করা ।
    • ক্ষেত থেকে আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা ।
    • জাব পোকা ও সাদা মাছি  এ রোগের বাহক ,তাই এদের দমনের জন্য   ইমিডাক্লোরোপ্রিড  গ্রূপের কীটনাশক যেমন : এডমায়ার ১ মিলি / লিটার হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা (১৫ দিন সবজি খাওয়া বা বিক্রি করা যাবে না )।

     ৪. পাউডারী মিলডিউ 

    লক্ষন :

    • পাতার উভয় পাশে প্রথমে সাদা সাদা পাউডার বা গুড়া দেখা যায় ।
    • ধীরে ধীরে এ দাগ গুলো  বড় ও বাদামি হয়ে শুকিয়ে যায় ।

    দমন:

    • আক্রান্ত পাতা  ও গাছ সংগ্রহ  করে  পুড়িয়ে ফেলা ।
    • প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম থিওভিট বা সালফেলাক্স /কুমুলাস  অথবা  ১০ গ্রাম ক্যালিনিক্স  ১৫ দিন পর পর  স্প্রে করে া েরোগ নিয়ন্ত্রন করা যায় ।

    ফসল সংগ্রহ 

    চারা গজানোর ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর  উচ্ছের গাছ  ফল দিতে থাকে । করলার ফুল আসতে দুই মাস লেগে যায় । স্ত্রী ফুলের পরাগায়নের ১৫-২০  দিনের  মধ্যে ফল  খাওয়ার উপযুক্ত হয় ।দু মাস পর্যন্ত ফল আহরন  করা যায় । 

    ফলন 

    উন্নত পদ্ধতিতে  চাষাবাদ করলে উচ্ছে  হেক্টর প্রতি ফলন ৭.৫-১০ টন , শতক প্রতি ফলন ৩০- ৪০ কেজি এবং করলা হেক্টর প্রতি ফলন  ২০-২৪ টন , শতক প্রতি ৮০-১০০ কেজি   পাওয়া যায় । 

    কোন মন্তব্য নেই:

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    যোগাযোগ ফর্ম

    নাম

    ইমেল *

    বার্তা *

    নওরোজ ।বাংলা নিউজ পেপার।

    নওরোজ হলো একটি প্রফেশনাল অনলাইন প্লাটফরম।এখানে আমরা শুধুমাত্র সেই সব জিনিস প্রদান করবো যেটা আপনি পছন্দ করেন।আমরা আপনাকে চাকরি ধর্ম বাণিজ্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিনোদন মুক্তকথা রাজনীতি লাইফস্টাইল শিক্ষা শিল্প ও সাহিত্য সর্বশেষ এর ওপর নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রদানে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।আমরা নওরোজ এর প্রতি আমাদের আবেগকে একটি ক্রমবর্ধমান অনলাইন ওয়েবসাইট এ পরিণত করতে কাজ করে যাচ্ছি।
    সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃতানবিরুল ইসলাম
    ইমেইল: mtitanbir2003@gmail.com
    ঠিকানা: বুকাবুনিয়া, বামনা-৮৭৩০