বসন্তের ফুল
বসন্তের আগমন গাছের দিক তাকালেই টের পাওয়া যায় ।নতুন পাতা আর ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় বসন্তের দিন গুলো । এ যেন স্বর্গীয় সৌন্দর্য !বসন্তের আগমনে নবপত্রপল্লবে শোভিত হয়ে উঠছে বনরাজি , ফুলের বাগান ।ছয় ঋতুর এই দেশে বসন্তের পরিবর্তনটিই চোখে পড়ার মত । সারা বছর ফুল থাকলেও বসন্তকালে ফুলের সংখ্যা যেন কয়েক গুন বেশি । ঋতু রাজ কে স্বাগত জানাতে ফুলে ফুলে ভরে যায় প্রকৃতি । যেদিকে চোখ যায় শুধু ফুল আর ফুল ।আরো পড়তে ক্লিক করুন
কাজী নজরুল ইসলাম বনরাজির এই বসন্ত রুপকে বলেছেন:-
এলো বনান্তে পাগল বসন্ত
বনে বনে মনে মনে রং সে ছড়ায় রে
চঞ্চল তরুণ দুরন্ত।
বনে বনে নানান ফুলের আয়োজন চলে বসন্ত জুড়ে । আজকে আমরা জানবো কিছু বসন্তের ফুল সম্পর্কে। বসন্তের ফুল নিয়েই আজকের ফিচার :-
রুদ্রপলাশ
বিগ্নোনিয়াসি পরিবারের একটি উদ্ভিদ। নাম রুদ্রপলাশ হলেও এটি আমাদের পরিচিত পলাশ ফুল নয় । এর বীজ দেখতে অনেকটা স্বচ্ছ কাগজের মধ্যে আটকানো একটি হৃদয় বলে মনে হয় ।বাংলাদেশ রমনা পার্ক ও বলধা গার্ডেনে এই গাছ রয়েছে । এর আদিবাস পশ্চিম আফ্রিকা হলেও আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা যায়।এর ইংরেজি নাম African Tulip । রুদ্রপলাশ মূলত বসন্তের ফুল ।বসন্তের শুরুতে বৃক্ষচূড়ায় দুর্লভ বাসন্তী রঙের রাশি রাশি রুদ্রপলাশ দেখে শিহরিত হয় মানব হৃদয় । এই ফুলের কুড়ি পলাশ ফুলের আদলে গড়া । রঙটাও তার মতো কিন্তু স্বভাব যেন একটু রুদ্র। হয় তো এ জন্য অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা এর নাম রুদ্রপলাশ রেখেছেন ।
পলাশ
পলাশ মাঝারি আকারের পুর্ণমোচী বৃক্ষ । পলাশ তার ফুলের জন্য বেশি পরিচিত। পলাশ গাছ সর্বোচ্চ ১৫ মিটার পর্যন্ত উচু হয়ে থাকে ।বসন্তে এ গাছে ফুল ফোটে ।টকটকে লাল,হলুদ, লালচে কমলা রঙের পলাশ ফুল দেখা যায়।পলাশ ২ থেকে ৪ সেমি লম্বা হয় । বসন্ত মানেই পলাশ ফুল ।বসন্তের উত্তাল বাতাসে আগুনরাঙা পলাশের রুপ দেখে মানুষ মুগ্ধ হয় । পলাশকে ঘিরে গানে গানে মেতে ওঠে বনের পাখিরা ।সবুজ অরন্যে পলাশ ফুলের হাসি যেন সবুজের বুকে অগ্নি শীখা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পলাশকে দেখে লিখেছেন :-
রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোকে পলাশে ,
রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত আকাশে ,
নবীন পাতায় লাগে হিল্লোল ।
কমলা লাল রঙের পলাশ ফুল দেখে মনে হয় যেন আগুন লেগেছে । এই অপরুপ সুন্দর্য শুধু বসন্তেই দেখা যায় ।
শিমুল
শিমুল ইংরেজিতে silk cotton । এটি মালভেসি পরিবারের একটি গনের নাম ।শিমুল পশ্চিম আফ্রিকা , ভারত , দক্ষিন -পূর্ব এশিয়ার স্থানীয় প্রজাতি।মালয় , ইন্দোনেশিয়া , দক্ষিন চীন , হংকং এবং তাইওয়ানে ব্যপকভাবে শিমুল চাষ হয় । শিমুল গাছে রয়েছে অসাধারন ঔষাধি গুন।শিমুল গাছের ছার ঘা সারাতে সহয়তা করে ।রক্ত আমাশয় দুর করে । শিমুল তুলা দিয়ে উন্নত মানের বালিশ তৈরি করা হয়। গান কবিতা গল্পের শেষ নেই শিমুল নিয়ে । বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলেই শিমুল ফুল দেখা যায়। বসন্তের উত্তাল হাওয়ায় সৌরভহীন টকটকে লাল শিমুল ফুল দেখে মুগ্ধ হয় নি এমন মানুষ খুজে পাওয়া যাবে না । গাছে গাছে ফুটে থাকা শিমুল ফুলই বসন্তের আগমন বার্তা জানিয়ে যায় । শিমুল গাছের শাখা গুলো বসন্তে লাল শাড়ির ঘোমটা পরা গ্রাম্য নববধু সাজে।
কৃষ্ণচূড়া
বসন্তের আরেক ফুল কৃষ্ণচূড়া ।কৃষ্ণচূড়া একটি বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ যার বৈজ্ঞানিক নাম ডেলোনিক্স রেজিয়া।গাচটি আগুন লাল ফুলের জন্য প্রসিদ্ধ।বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি পাওয়া যায় ।কৃষ্ণচূড়া গাছ উচ্চতায় ১২ মিটার হয় ।বাংলাদেশে বসন্ত কালে এ ফুল ফোটে ।
কবি নজরুল গানে গানে ফুটিয়ে তুলেছেন কৃষ্ণচূড়া ফুলের সৌন্দর্য:-
কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মন্জুরি কর্নে-
আমি ভুবন ভুলাতে আসি গন্ধে ও বর্ণে ।
কৃষ্ণচূড়া ফুল ফোটার মাঝে রোদে পোড়া নিসর্গ যেন জীবন ফিরে পায় । রক্তরাঙা ফুলের নয়নাভিরাম সৌন্দার্য গ্রামের সবুজ প্রান্তর ছাড়িয়ে রাঙিয়ে দেয় আমাদের মন।আমাদের দেশে লাল ও লাল হলদেটে এই দুই ধরনের ফুল ফুটতে দেখা যায়। তবে লাল কৃষ্ণচূড়াই বেশি চোখে পড়ে । হলদেটে কৃষ্ণচূড়া এখন প্রায় বিরল।
অশোক
অশোক উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম (saraca asoca ) । কমলা আর লালে মেশানো ফুল গুলো ঝলমল করে বসন্ত এলেই । হেমন্ত অবধি ফুল ফোটে ।ফুল প্রেমিদের মুগ্ধ করে গাছের কান্ড ফুড়ে বেরিয়ে পড়ে থোকা থোকা ফুল । ছোট ফুল কিন্তু বহু পৌষ্পিক ,ছত্রাকৃতি মন্জরি আকারে বড় । অজস্র ফুলে ঘনবদ্ধ অশোকমন্জরি বর্ন ও গড়নে আকর্ষনীয় ।তাজা ফুলের রঙ কমলা কিন্তু বাসি ফুলের রঙ লাল ।শোক বা দুঃখ নাশ করে বলেই এর নাম অশোক । রোগ নিরাময়ে ভেষজ গুন , শীতল ছায়া , মধুরিমা সুবাস সবার মনে দোলা দেয় ।অশোক ফুল প্রেমের প্রতিক।
রবীন্দ্রনাথের গানেও লেগেছে অশোকের রঙ:-
তোমার অশোকে কিংশুকে
অলক্ষ্য রঙ লাগলো আমার
অকারনের সুখে ।
হিমঝুরি
বাংলাদেশে এই গাছের নাম কর্কগাছ ।ইংরেজিতে millingtonia ,হিন্দিতে এটি আকাশ নিম নামেও পরিচিত । রবীন্দ্রনাথ নামকরন করেছেন হিমঝুরি।হিমঝুরি সুউচ্চ চির সবুজ বৃক্ষ ,খারা ডালপালায় নোয়ানো আগা ।মধুগন্ধী ফুল ফোটে রাতের বেলা ।ভোরে ঝরে যায় । যৌগিক মন্জরি , নলাকার সাদা সাদা ফুল ।তারার মত পাঁচটি খুদে পাপড়ি ।সাদা বা হলুদ গর্ভকেশর যুক্ত।
রক্তকাঞ্চন
রক্তকাঞ্চন বৈজ্ঞানিক নাম (phanera variegata ) (ইংরেজিতে orchid tree)। ফুলপ্রেমীদের কাছে রক্তকাঞ্চন ফুল একটি পরিচিত নাম । ফুলের রঙ ,শোভা আর সৌন্দার্য দেখে রক্তকাঞ্চন ফুল সবার একটু বেশি পছন্দ হয় । রক্তকাঞ্চন পত্রঝরা গাছ ।শীত মৌসুমে গাছের পাতা ঝরে যায় ।বসন্তে ফুল ফোটার সময় গাছ পত্র শূন্য থাকে ।এ সময় রক্তিম ফুলে ফুলে গাছ ভরে যায়। ফুটন্ত ফুল গাছ সবার নজর কেড়ে নেয় ।ফুল ঘন মেজেন্টা রঙের । প্রতিটি ফুলে পাঁচটি পাপড়ি থাকে, এর মাঝে একটি পাপড়ি রঙে ব্যাতিক্রম , গোড়ার দিকে গাঢ় বেগুনি রঙের কারুকার্য । বসন্তের পুরো সময় গাছে ফুল থাকে।রক্তকাঞ্চনে রয়েছে ভেষজ গুনাগুন ।
কুসুম
কুসুম ফুল একটি বর্ষজীবি উদ্ভিদ । কমলা -হলুদ রঙের ফুলগুলি প্রায় ১ থেকে ১.৫ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়।কুসুম গাছ দুই ধরনের একটি বেশ বড় এবং উচ , অন্যটি খুবই ছোট ও ঝোপালো ধরনের ।মূলত ছোট গাছ থেকেই রঙ পাওয়া যায় । বীজের জন্যই কুসুম ফুলের চাষ করা হয় । এর বীজ খাদ্যদ্রব্য রঙিন ও সুঘ্রানযুক্ত করতে এবং ঔষধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।এর বীজ থেকে তেল সংগ্রহ করা হয় ।কুসুম ফুল বসন্তে ফোটা শুরু হয় গ্রীষ্ম কালে পরিপূর্ন ভাবে ফোটে ।
ক্যামেলিয়া
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ক্যামেলিয়া কবিতায় ক্যামেলিয়া ও এর বৈশিষ্ট নিয়ে তার চমকের প্রকাশ করেছেন :-
তনুকা বললে , দামি দুর্লভ গাছ ,
এ দেশের মাটিতে অনেক যত্নে বাঁচে।
জিগেস করলেম নামটা কী ?সে বললে , ক্যামেলিয়া ।
চমক লাগল--।
বসন্ত মৈাসুমে এ ফুল দেখা যায় । প্রলুব্ধকারী রঙ আর মনোলোভা সুবাসের জন্য ক্যামেলিয়ার ভিন্নধর্মী আকর্ষন রয়েছে ।এর উজ্জল সবুজ পাতা ফুলের সৌন্দার্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে ।একক ও যুগল পাপড়িবিশিষ্ট এ ফুলে গোলাপের আদল খুজে পান প্রকৃতিবিদেরা ।কবি সাহিত্যিকদের কাছে ক্যামেলিয়া মানে আবেগ অনুভুতির মিশ্রন।ক্যামেলিয়া ফুলের আদি নিবাস জাপান ও কোরিয়া।এর বৈজ্ঞানিক নাম ক্যামেলিয়া জাপানিকা ।এর উচ্চতা ১০ মিটারের বেশি হয় ।
স্বর্ণচাঁপা
চাঁপা বা চম্পক ভারত-উপমহাদেশ ও মালয় অঞ্চলের দীর্ঘাকৃতির চির সবুজ বৃক্ষ।ইংরেজিতে champak ,বৈজ্ঞানিক নাম Maichelia champak ।এই গাছের সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ১০০ ফুট ।চাঁপা গাছের পাতা ৮-১০ ইঞ্চি দীর্ঘ ও বর্শাফলকের মতো হয়ে থাকে এর ফুলের ব্যাস ২ ইঞ্চি ।পাপড়ির সংখ্যা প্রায় ১৫ টি ।আকৃতি ছুরির ফলার মতো । ফুলের মধ্যে একটি দন্ডের শুরুতে একগুচ্ছ পরাগ কেশর । ফুলের রঙ সোনালী বা ম্লান হরুদ বর্নের । চাঁপা ফুল তীব্র সুগন্ধযুক্ত হয়ে থাকে । চাঁপা ফুল বাংলাদেশে বসন্তকালে ফোটে । ফুল গুলো গুচ্ছ আকারে জন্মায় । ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে চাঁপা গাছের বিভিন্ন অংশ ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয় ।এর কাঠ আসবাব ও গৃহস্থালীর কাজে লাগে।
কাঠাল চাঁপা
বৈজ্ঞানিক নাম Artabotrys hexapetalus । ভারতের বিভিন্ন স্থানে এটি মনোরন্জিনী নামে পরিচিত ।গাছটি মাঝারি আকারের লতানো গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ । লম্বায় ৮-১০ ফুট । এর লতা দীর্ঘ ,শাখা ঝুকে থাকে । আদি নিবাস এন্দো মালয় । আমাদের দেশে কিছু বৃক্ষ রয়েছে যা সহযেই দেখা যায় না । কাঁঠাল চাঁপা এমন একটি গাছ ।কাঁঠাল চাঁপা হলুদ রঙের ফুল ।পাপড়ি সংখ্যা ৬ টি । এই ফুল থেকে কাঁঠালের তীব্র সুবাস বের হয় । পাতার কক্ষে এক বা একাদিক ফুল ফোটে । এই ফুলের নির্যাস সুগন্ধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ।
কনকচাঁপা
কনকচাঁপা দীর্ঘাকৃতির চিরহরিৎ বৃক্ষ ,গাছ ৪০ থেকে ৫০ ফুট উচ হয় । গোলাকৃতির পাতা গুলোর এক পিঠ উজ্জল ,সবুজ ও মসৃন কিন্তু অন্য পিঠ রুক্ষ ও সাদা ধুসর ।ফুলের কলি বাদামি হলুদ, গোলাকৃতি ও দীর্ঘ । আকারে ফুল বেশ বড় । বসন্তকালে গাছে ফুল আসে ।ফুলের রঙ সোনার মতো উজ্জল হলুদ সুঘ্রানযুক্ত । ভারত ও মালয়শিয়া কনকচাঁপার আদিবাস । ছায়াগন ও সুগন্ধি ফুলের জন্য এর কদর রয়েছে । কনকচাঁপার রয়েছে ভেষজ গুন রক্তস্রাব বন্ধ করতে সহয়তা করে । পাতা বসন্ত রোগের ঔষধ ।
ফিচারটি শেষ পর্যন্ত পড়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ ।এই রকম আরো পোষ্ট পড়তে নওরোজের সাথেই থাকুন।












চমৎকার লেখা ।
উত্তরমুছুন